জীবনে অনেক যাত্রাপালা দেখেছি। যাত্রাপালায় একটি খল চরিত্র থাকতো। আজ পর্যন্ত এমন কোনো যাত্রাপালা দেখিনি যার খল চরিত্রের পরিণতি সুখকর হয়েছে। পালার শেষ দৃশ্যে এটা দেখে বুকভরা প্রশান্তি নিয়ে ভোররাতে বাড়ি ফিরতাম।
গ্রামবাংলার যাত্রাপালা ছিলো কেবল বিনোদনের আয়োজন নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তার এক সহজ পাঠ। প্রযুক্তি ও গণমাধ্যমের অভাবের যুগে যাত্রাপালাই মানুষকে শেখাতো—ক্ষমতা কীভাবে বিকৃত হয়, ষড়যন্ত্র কীভাবে জন্ম নেয় এবং শেষ পর্যন্ত ন্যায়ের অবস্থান কোথায় দাঁড়ায়।
যাত্রাপালার প্রতিটি গল্পেই দুটি চরিত্র ছিলো অবিচ্ছেদ্য—‘বিবেক’ এবং ‘খল’। এই দুই চরিত্রের সংঘাতই মূলত গল্পের চালিকাশক্তি। আজকের সমাজ ও রাজনীতির দিকে তাকালে এই চরিত্রগুলোকে রূপক হিসেবে না দেখার কোনো সুযোগ নেই।
বিবেক আজ মঞ্চে নেই, দর্শক সারিতে
যাত্রাপালার বিবেক চরিত্রটি সরাসরি রাজত্ব করতো না। সে ক্ষমতার কেন্দ্রেও ছিলো না। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলো—সে সত্য জানতো এবং ইঙ্গিতে তা প্রকাশ করতো। গানের ভাষায় সে সতর্ক করতো রাজাকে, সচেতন করতো জনগণকে।
সমসাময়িক সমাজে এই বিবেকের অবস্থান কোথায়? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিবেক এখন মঞ্চে নেই—সে নেমে এসেছে দর্শক সারিতে। বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক কিংবা সচেতন নাগরিক—অনেকেই সত্য জানেন, কিন্তু তা প্রকাশ করেন রূপকের আড়ালে, সামাজিক মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে বা নীরবতায়। যেন আজকের বাস্তবতায় সত্য বলা সরাসরি নয়, বরং ইঙ্গিতের ভাষায়ই নিরাপদ।
খল চরিত্রের আধুনিক রূপ
যাত্রাপালার খল চরিত্র কখনোই নিজেকে খল বলে পরিচয় দিতো না। সে নিজেকে দেশরক্ষক, ধর্মরক্ষক কিংবা শাসনব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করতো। ক্ষমতার ভাষা, ভয় ও প্রলোভনের মাধ্যমে সে নিজের অবস্থান পোক্ত করতো।
আজকের রাজনীতি ও সমাজেও খল চরিত্রের এমন রূপ নতুন নয়। ক্ষমতার দখল, আইনকে নিজের মতো ব্যবহার, ভিন্নমতকে দমন, নৈতিকতাকে সুবিধামতো ব্যাখ্যা—সবই আধুনিক খল চরিত্রের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। পার্থক্য শুধু এটুকুই, যাত্রামঞ্চে খল চরিত্রের মুখোশ খুলে যেতো শেষ দৃশ্যে; বাস্তবে সেই দৃশ্য অনেক সময় দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকে।
যাত্রাপালার নিশ্চিত পরিণতি বনাম বাস্তবের অনিশ্চয়তা
যাত্রাপালার সবচেয়ে বড় স্বস্তি ছিলো—শেষ দৃশ্যের নিশ্চয়তা। দর্শক জানতো, যতো দাপটই দেখাক না কেন, খল চরিত্রের পতন অনিবার্য, আর ঘটতোও তাই। দর্শক দর্শক শেষ দৃশ্য দেখে ভোররাতে বুকভরা প্রশান্তি নিয়ে বাড়ি ফিরতো।
কিন্তু বাস্তব সমাজে সেই নিশ্চয়তা এতটা স্পষ্ট নয়। এখানে খল চরিত্র অনেক সময় দৃশ্যপট বদলে ফেলে, সংলাপ পাল্টায়, এমনকি নিজেকে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। তবুও ইতিহাস বলে—স্থায়ীভাবে অন্যায় কখনোই প্রতিষ্ঠিত হয় না। শুধু সময়টা দীর্ঘ হয়।
দর্শক থেকে নাগরিক হয়ে ওঠার প্রশ্ন
যাত্রাপালার দর্শকরা জানতো—তারা দর্শকই। কিন্তু আজকের সমাজে প্রশ্নটা ভিন্ন। আমরা কি কেবল দর্শক হয়েই থাকবো, নাকি বিবেকের ভূমিকায় ফিরবো? যাত্রাপালার বিবেক চরিত্র যেমন গানের আড়ালে হলেও কথা বলতো, আজকের সমাজেও সেই দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই।
সমসাময়িক বাস্তবতা হয়তো যাত্রাপালার মতো সহজ নয়। কিন্তু যাত্রাপালার শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক—খল চরিত্র যতই শক্তিশালী হোক, সে চিরস্থায়ী নয়। আর বিবেক, যদি সম্পূর্ণ নীরব না হয়, শেষ দৃশ্যের পথ ঠিক করতেই সাহায্য করে।
যাত্রাপালা শেষ হলে যেমন মঞ্চ অন্ধকার হয়ে যেতো, বাস্তব সমাজের মঞ্চে সেই অন্ধকার এখনও পুরোপুরি নামেনি। প্রশ্ন হলো—শেষ দৃশ্যটি আমরা কবে দেখবো, আর সেই দৃশ্যে আমরা দর্শক থাকবো, নাকি বিবেকের ভূমিকায় থাকবো?








Leave a Reply